হিমোফিলিয়া
ভূমিকা
ধরুন ছোট্ট একটি কাটা লাগলো হাতে। সাধারণত কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তপাত থেমে যায়। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। হিমোফিলিয়া এমন একটি জেনেটিক রোগ, যেখানে শরীর ঠিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধাতে পারে না। ফলে সামান্য আঘাতেও দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এটি মূলত বংশগত এবং বেশি দেখা যায় পুরুষদের মধ্যে, যদিও নারীরাও আক্রান্ত হতে পারেন।
কারণ
আমাদের শরীরে কিছু বিশেষ প্রোটিন থাকে, যেগুলো রক্ত জমাট বাঁধাতে সাহায্য করে। এই প্রোটিনগুলোর ঘাটতির কারণেই হিমোফিলিয়া হয়।
- হিমোফিলিয়া A: ফ্যাক্টর VIII-এর অভাব।
- হিমোফিলিয়া B: ফ্যাক্টর IX-এর অভাব।
এই সমস্যা সাধারণত X-ক্রোমোজোমের জিনগত পরিবর্তনের কারণে ঘটে।
লক্ষণ
রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- সামান্য আঘাতেও অতিরিক্ত রক্তপাত
- ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়া
- সহজেই কালশিটে পড়া
- জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলা
শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ
- অকারণে কান্না বা অস্বস্তি
- ছোট আঘাতেও বড় কালশিটে
- টিকা নেওয়ার পর দীর্ঘ রক্তপাত
- হাঁটু বা কনুই ফুলে যাওয়া
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ
গুরুতর ক্ষেত্রে মাথায় সামান্য আঘাতও বিপজ্জনক হতে পারে। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- তীব্র মাথাব্যথা
- বারবার বমি
- অতিরিক্ত ঘুমভাব
- হঠাৎ দুর্বলতা বা খিঁচুনি
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
- মাথায় আঘাতের পর অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে
- রক্তপাত বন্ধ না হলে
- জয়েন্ট ফুলে গেলে ও ব্যথা বাড়লে
হিমোফিলিয়ার ধরন
- হিমোফিলিয়া A
- হিমোফিলিয়া B
- হিমোফিলিয়া C (দুর্লভ)
ঝুঁকির কারণ
এটি সাধারণত বংশগত। তবে বিরল ক্ষেত্রে অটোইমিউন সমস্যার কারণেও পরবর্তীতে হতে পারে।
কিভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে আসে?
হিমোফিলিয়া A ও B X-linked recessive প্যাটার্নে আসে। পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নারীরা বাহক হতে পারেন।
নারীদের ক্ষেত্রে
কিছু নারীও হালকা উপসর্গ যেমন অতিরিক্ত মাসিক রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়ার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
রোগের তীব্রতা
- মৃদু: ৫%–৩০%
- মাঝারি: ১%–৫%
- তীব্র: ১% এর কম
রোগ নির্ণয়
রক্ত পরীক্ষা করে ক্লটিং ফ্যাক্টরের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
আধুনিক চিকিৎসা
২০২৩ সালে FDA Roctavian™ নামে একটি জিন থেরাপি অনুমোদন করেছে, যা গুরুতর হিমোফিলিয়া A রোগীদের জন্য নতুন আশা এনে দিয়েছে।
হিমোফিলিয়ার সঙ্গে জীবন
যেসব কাজ এড়ানো উচিত
- ফুটবল, রাগবি
- বক্সিং
- মোটরবাইক চালানো
যেসব ওষুধ এড়ানো উচিত
- অ্যাসপিরিন
- আইবুপ্রোফেন
- ওয়ারফারিন
জীবনমান উন্নত করার উপায়
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
- ভালো দাঁতের যত্ন
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
“Royal Disease” কেন বলা হয়?
ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ছিলেন হিমোফিলিয়া B-এর বাহক। তার বংশধরদের মাধ্যমে ইউরোপীয় রাজপরিবারে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
উপসংহার
হিমোফিলিয়া একটি আজীবন অবস্থা হলেও সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। সময়মতো নির্ণয় ও নিয়মিত চিকিৎসাই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি।